গোল করে নিজেই অবাক কোলাসো

অঞ্জন চ্যাটার্জী, এনএফবিঃ

পরপর দুই ম্যাচে দু’টি অসাধারণ গোল। দুই ম্যাচেই সেরা খেলায়োড়ের পুরস্কার। সর্বোচ্চ ভারতীয় গোলদাতাদের তালিকায় এক নম্বরে জায়গা করে নেওয়া। আট ম্যাচে পাঁচ গোল করে সর্বোচ্চ স্কোরারদের তালিকায় তিন নম্বরে জায়গা করে নেওয়া— সব মিলিয়ে যেন স্বপ্নের দুনিয়ায় বিচরণ করছেন লিস্টন কোলাসো। ফুটবল জীবনে এত ভাল সময় তিনি কখনও কাটিয়েছেন বলে মনে হয় না। এই স্তরে এমন ধারাবাহিক সাফল্য আর কবেই বা পেয়েছেন তিনি?

বুধবারের ম্যাচের শেষে চলতি আইএসএলের সেরা গোলস্কোরারদের তালিকায় প্রথম তিনে রয়েছেন যে ভারতীয়, তিনি এটিকে মোহনবাগানের লিস্টন কোলাসো। আটটি ম্যাচে তাঁর গোলসংখ্যা পাঁচ। গতবার সুনীল ছেত্রী ছাড়া আর কোনও ভারতীয় এই তালিকায় প্রথম দশের মধ্যে জায়গা পায়নি। এবার লিগের অষ্টম রাউন্ডের শেষে বার্থোলোমিউ ওগবেচে, ইগর অ্যাঙ্গুলোর পরেই ও সতীর্থ হুগো বুমৌসের সঙ্গে তিন নম্বরে রয়েছেন কোলাসো।

বুধবারের ম্যাচে দুর্দান্ত এক গোল করে দলকে এগিয়ে দেন তিনি। পরে রয় কৃষ্ণা আর একটি দুর্ধর্ষ গোল করে এফসি গোয়ার বিরুদ্ধে ব্যবধান বাড়ান। ২৩ মিনিটের মাথায় মাঝমাঠে দীপক টাঙরির পাসে বাঁ দিকের উইংয়ে বল পান কোলাসো। কোণাকুণি কিছুটা এগিয়ে বিপক্ষের বক্সের সামনে থেকে সোজা গোলের উদ্দেশ্যে ‘বানানা কিক’ নেন তিনি এবং লাফিয়ে ওঠা গোলকিপার ধীরজ সিংয়ের মাথার ওপর দিয়ে তা সোজা জালে জড়িয়ে যায়।

এই গোল প্রসঙ্গে কোলাসো এটিকে মোহনবাগান মিডিয়াকে বলেন, “অনেকেই বলছেন, বুধবারের ম্যাচে আমার গোলটা বিশ্বমানের এবং এই গোলটা এ বারের আইএসএলের সেরা গোলের তালিকায় থাকবে। কিন্তু সত্যি বলতে, আমি ভাবিনি যে, বলটা এ রকম বাঁক খেয়ে গোলে ঢুকবে। শটটা অবশ্য আমি গোল লক্ষ্য করেই নিয়েছিলাম”।

ম্যাচের পর রাতে হোটেলে ফিরেও গোলটা বারবার দেখেছেন বলে জানান কোলাসো। বলেন, “টিভিতে গোলটা বারবার দেখাচ্ছিল। হোটেলে ফিরে নিজের গোলটা দেখে বেশ রোমাঞ্চিত হই। ভাবছিলাম, আমিও তা হলে এ রকম গোল করতে পারি। যে পাঁচটা গোল করেছি এ বারের আইএসএলে, আমার মনে হয়, এফসি গোয়ার বিরুদ্ধে এই গোলটাই সেরা। শটটা সর্বশক্তি দিয়ে নিয়েছিলাম। এ রকম লম্বা গোলমুখী শট আমি নিয়মিত অনুশীলন করি। তারই সুফল পেলাম। গোলটা উৎসর্গ করতে চাই আমার মা নজরানাকে।”

প্রাক্তন ক্লাব এফসি গোয়ার বিরুদ্ধে গোল করে আরও বেশি খুশি গোয়ার এই ২৩ বছর বয়সি ফরোয়ার্ড। বলেন, “আমার প্রবল ইচ্ছে ছিল এই ম্যাচেও গোল করব। গোয়ায় আমার বাড়িতে নিয়মিত খেলা দেখেন আমার বাবা-মা। তাঁরাও চেয়েছিলেন আমি এই ম্যাচে একটা গোল করি। গোলটা করে তৃপ্তি পেয়েছি, উপভোগও করেছি। পুরোন দলের বিরুদ্ধে গোল করার আবেগই আলাদা। গোয়ার বিরুদ্ধে আমরা জিতেছি বলে আমি আরও বেশি তৃপ্ত”।

এই জয়ের ফলে সেরা চারে ফিরে এল এটিকে মোহনবাগান। আট ম্যাচে ১৪ পয়েন্ট নিয়ে তারা এখন তিন নম্বরে। মুম্বই সিটি এফসি (১৬) ও হায়দ্রাবাদ এফসি-র (১৫) পরেই। এই প্রসঙ্গে কোলাসো বলেন, “আমাদের এখন লক্ষ্য ম্যাচ ধরে ধরে এগোনো। আমরা ফের শেষ চারে ঢুকে পড়েছি। রয় কৃষ্ণার গোলটাও দারুণ। ও আবার গোল পেতে শুরু করেছে। এটা ভাল দিক। রয় আমাদের আদর্শ। এখনও অনেক দূর যেতে হবে আমাদের। লম্বা লীগ। জয়ের ধারা বজায় রাখতে হবে। জিতলেও এখনও অনেক ভুল-ত্রুটি রয়ে গিয়েছে। কারণ পরের ম্যাচ শক্তিশালী হায়দ্রাবাদের বিরুদ্ধে। আমাদের আরও সতর্ক হয়ে খেলতে হবে।”

গত মরশুমে এই হায়দ্রাবাদ এফসি-র হয়েই মাঠে নেমে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর এই মরশুমের জন্য রেকর্ড ট্রান্সফার ফি (কোনও ভারতীয় ফুটবলারের ক্ষেত্রে) দিয়ে তাঁকে নিজেদের শিবিরে নিয়ে আসে এটিকে মোহনবাগান। গত বার হায়দ্রাবাদ এফসি-র হয়ে ১৯টি ম্যাচ খেলেন কোলাসো। দু’টি গোল করেন ও তিনটিতে অ্যাসিস্ট করেন। তার আগের তিন মরশুমে ১২টি ম্যাচ খেলে দু’টি গোল করেন তিনি। আইএসএলে যে মোট ন’টি গোল রয়েছে তাঁর, তার মধ্যে পাঁচটিই এ বারে। আরও গোল হয়তো পাবেন এই ২৩ বছর বয়সি ফরোয়ার্ড।

এ বারের লিগে যে পাঁচটি গোল তিনি পেয়েছেন, প্রতিটিই স্মরণীয়। প্রথম ম্যাচে কেরালা ব্লাস্টার্সের বিরুদ্ধে ৫০ মিনিটের মাথায় বক্সের মাথা থেকে ঠাণ্ডা মাথায় পায়ের হালকা টোকায় দ্বিতীয় পোস্টের দিকে ভাসানো বল গতিপথ সামান্য বদলে গোলে ঢুকে যায়। কলকাতা ডার্বিতে ২৩ মিনিটের মাথায় মাঝমাঠ থেকে কোলাসোকে নিখুঁত বল বাড়ান হুগো বুমৌস। বাঁ দিক দিয়ে ওঠা গোয়ানিজ ফরোয়ার্ডকে বক্সের ডান দিকে এসে আটকাতে গিয়ে ব্যর্থ হন গোলকিপার অরিন্দম ভট্টাচার্য। সেই সুযোগ দারুণ ভাবে কাজে লাগিয়ে গোলে কোণাকুণি শট নেন কোলাসো। চেন্নাইন এফসি-র বিরুদ্ধে মাঝমাঠ পেরিয়ে রয় কৃষ্ণার অসাধারণ লম্বা পাসই ছিল তাঁর গোলের উৎস্য। বাঁ দিকের উইং দিয়ে উঠে বক্সে ঢুকে কোণাকুণি শটে বল জালে জড়িয়ে দেন তিনি। গত মঙ্গলবার নর্থইস্ট ইউনাইটেড এফসি-র বিরুদ্ধে বিরতিতে যাওয়ার মিনিট খানেক আগে রয় কৃষ্ণার লম্বা হাওয়ায় ভাসানো সেন্টারে মাপা কোণাকুণি হেডে বল জালে জড়িয়ে দিতে ভুল করেননি তিনি।

এত দিন সেভাবে যোগ্য সঙ্গত না পাওয়ার জন্যই হয়তো নিজেকে মেলে ধরতে পারেননি কোলাসো। গতবার তাঁর গোল কনভারশন রেট ছিল মাত্র ৬ শতাংশ। অর্থাৎ যতগুলি শট গোলে নিয়েছিলেন, তার মধ্যে মাত্র ৬ শতাংশ গোলে পরিণত করতে পেরেছিলেন। এ বার সেই হিসেবটা দাঁড়িয়েছে ২৩ শতাংশ। অর্থাৎ, নিজেকে অনেক উন্নত করে তুলেছেন কোলাসো। আর তাঁর এই উন্নতিতে প্রাক্তন কোচ হাবাসের অবদান অনস্বীকার্য। এখন তিনি অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী।

Leave a Reply

Your email address will not be published.