অবশেষে জয় পেল বাগান

অঞ্জন চ্যাটার্জী, এনএফবিঃ

হুগো বুমৌস ফর্মে ফিরতেই বোধহয় মেজাজও বদলে গেল এটিকে মোহনবাগান শিবিরের। চার ম্যাচে জয়হীন থাকার পরে জয়ে ফিরল তারা। মঙ্গলবার ফতোরদার জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে প্রতিবেশি রাজ্যের দল নর্থইস্ট ইউনাইটেড এফসি-কে ৩-২-এ হারিয়ে চলতি লিগের তিন নম্বর জয়টা তুলে নিল সবুজ-মেরুন বাহিনী। হুগো বুমৌস ফর্মে ফিরে দলকে উপহার দিলেন জোড়া গোল। তাঁর দু’গোল ও লিস্টন কোলাসোর অসাধারণ হেডে করা গোলই এ দিন জয় এনে দেয় কলকাতার দলকে। এ দিন ডাগ আউটে ছিলেন তাদের নতুন কোচ হুয়ান ফেরান্দো। তাঁর পজিশন ও পাস নির্ভর ফুটবলের কৌশল মাঠে প্রয়োগ করে সাফল্যে ফিরল সবুজ-মেরুন শিবির।

ম্যাচের দু’মিনিটের মাথায় গোল করে অবশ্য এ দিন দলকে এগিয়ে দিয়েছিলেন নর্থইস্টের কেরলিয়ান ফরোয়ার্ড ভিপি সুহের। সেই গোল কোলাসো শোধ করেন প্রথমার্ধের একেবারে শেষ মিনিটে। দ্বিতীয়ার্ধে আক্রমণের ঝড় বইয়ে দেয় সবুজ-মেরুন বাহিনী। সারা ম্যাচে যতগুলি সুযোগ পায় তারা, তার অর্ধেক কাজে লাগাতে পারলেও এ দিন অন্তত পাঁচ গোল পেত তারা। সারা ম্যাচে আটটি শট গোলে রেখেও (নীচে পরিসংখ্যান দেখুন) তিনটির বেশি গোল পাননি তারা। মনবীর সিং একাধিক গোলের সুযোগ নষ্ট না করলে আরও বেশি গোল পেত গতবারের রানার্স আপরা। এই জয়ের ফলে সাত ম্যাচে ১১ পয়েন্ট নিয়ে লিগ টেবলে সাত থেকে পাঁচ নম্বরে উঠে এল এটিকে মোহনবাগান। অন্য দিকে, আট ম্যাচে সাত পয়েন্ট-সহ নয় নম্বরেই রয়ে গেল লিগের একমাত্র ভারতীয় কোচের অধীনস্থ দল নর্থইস্ট ইউনাইটেড এফসি।

২ মিনিটঃ নর্থইস্ট ১-০। ডানদিক থেকে মাথিয়াস কোরিয়ারের কর্ণারে প্রথম পোস্টের সামনে ফ্লিক করে বল গোলে ঠেলে দেন ভিপি সুহের।
৪৫+৩ মিনিটঃ ১-১। রয় কৃষ্ণা বক্সের বাইরে ডানদিক থেকে লম্বা হাওয়ায় ভাসানো ক্রস দেন বক্সের মধ্যে বাঁ দিকে থাকা অরক্ষিত লিস্টনকে। মাপা কোণাকুনি হেডে বল জালে জড়িয়ে দিতে ভুল করেননি তিনি।
৫৩ মিনিটঃ ১-২। বক্সের মধ্যে বাঁ দিক থেকে বুমৌসকে মাইনাস দেন শুভাশিস এবং সেই বল পেয়েই ঠাণ্ডা মাথায় দুই ডিফেন্ডারকে ধোকা দিয়ে সোজাসুজি গোলে বল ঠেলে দেন ফরাসি মিডফিল্ডার।
৭৬ মিনিটঃ ১-৩। ডানদিক দিয়ে ওঠা বুমৌসকে মাঝমাঠ থেকে বল বাড়িয়েছিলেন জনি কাউকো। নিখুঁত সেই পাস থেকে বল পেয়ে বক্সে ঢুকে ফের ঠাণ্ডা মাথায় পায়ের টোকায় গোলে বল ঠেলে দেন বুমৌস।
৮৭ মিনিটঃ ২-৩। বক্সের মধ্যে শুভাশিস বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে হেড করলে তাঁর মাথার বাঁ দিকে লেগে বল চলে যায় অরক্ষিত শেরিফের কাছে। গোলে বল ঠেলতে তাঁর কোনও অসুবিধাই হয়নি।
মঙ্গলবার দলে মাত্র একটি পরিবর্তন করে মাঠে নামে এটিকে মোহনবাগান। জনি কাউকোর জায়গায় প্রথম এগারোয় আসেন কার্ল ম্যাকহিউ। শুধু রয় কৃষ্ণাকে সামনে রেখে ও তাঁর পিছনে লিস্টন কোলাসো, হুগো বুমৌস ও মনবীর সিংকে রেখে ৪-২-৩-১-এ দল সাজান তাঁদের নতুন কোচ হুয়ান ফেরান্দো।

অন্য দিকে, তিন ভারতীয় ফরোয়ার্ডে শুরু করা নর্থইস্ট এ দিনও জামাইকান ফরোয়ার্ড দেশর্ন ব্রাউনকে পায়নি। দুই বিদেশি মিডফিল্ডার খাসা কামারা, হারনান সান্তানা ও অস্ট্রেলীয় ডিফেন্ডার প্যাট্রিক ফ্লোটম্যান— এই তিন বিদেশিকে নিয়ে প্রথম এগারো নামান ভারতীয় কোচ খালিদ জামিল।

শুরুতেই হঠাৎ গোল খেয়ে যায় এটিকে মোহনবাগান। কর্নার কিক থেকে হেডে গোল করে দলকে এগিয়ে দেন জামিলের দলের নির্ভরযোগ্য ফরোয়ার্ড ভিপি সুহের। মাত্র দু’মিনিটের মাথায় ডানদিক থেকে মাথিয়াস কোরিয়ারের কর্ণারে প্রথম পোস্টের সামনে ফ্লিক করে বল গোলে ঠেলে দেন সুহের। শুভাশিস বোস তাঁকে নজরে রাখার দায়িত্বে থাকলেও তিনি ব্যর্থ হন। সুহেরের সামনে ছিলেন তিরি। তিনিও বল আটকাতে পারেননি এবং গোলকিপার অমরিন্দরও এমন আকস্মিক ভাবে ধেয়ে আসা বলের জন্য সম্ভবত তৈরি ছিলেন না।

শুরুতেই গোল খাওয়ার পরে নড়েচড়ে বসে এটিকে মোহনবাগান এবং পজেশন বাড়িয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা শুরু করে তারা। সারা ম্যাচেই এই একই পন্থা দেখা যায় এটিকে মোহনবাগানের খেলায়। হাবাসোত্তর জমানায় এ দিন প্রথম পরিবর্তন এই জায়গাতেই লক্ষ্য করা যায়। তবে হুগো বুমৌস শুরুর দিকে এত নেমে খেলছিলেন যে, রয় কৃষ্ণার সঙ্গে ঠিকমতো যোগাযোগ রাখতে পারছিলেন না। তিনি মাঝ বরাবর ওপরে ওঠার চেষ্টা করলেই তাঁকে ঘিরে ধরছিলেন বিপক্ষের খেলোয়াড়রা। তবে বুমৌস ক্রমশ এই বাধা কাটিয়ে ডান উইং দিয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে এটিকে মোহনবাগানের আক্রমণের তীব্রতাও বাড়তে থাকে। এ দিন নর্থইস্টের রক্ষণবিভাগও যথেষ্ট সঙ্ঘবদ্ধ ফুটবল খেলে। তবে বিপক্ষের ঘন ঘন আক্রমণের চাপে শেষ পর্যন্ত হতোদ্যম হয়ে যায়। তবে তাঁরা তৎপর না থাকলে হয়তো প্রথমার্ধে দু-তিন গোল দিয়ে দিত সবুজ-মেরুন শিবির।

১৫ মিনিটের মাথায় গোলকিপার মিরশাদ মিচুর মাথার ওপর দিয়ে গোলে ঠেলতে গিয়ে তাঁর মুখে বল মারেন রয় কৃষ্ণা। ১৯ মিনিটের মাথায় মনবীরের লো ক্রসে গোলে শট নেন কৃষ্ণা। কিন্তু তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে সাইড নেটে জড়িয়ে যায়। ২৩ মিনিটের মাথায় মনবীরের দূরপাল্লার গোলমুখী শট আটকে দেন মিরশাদ। ২৮ মিনিটের মাথায় বিপক্ষের বক্সের সামনে থেকে নেওয়া ফ্রি কিকে বারের ওপর দিয়ে বল উড়িয়ে দেন কোলাসো। ৩০ থেকে ৩৫ মিনিটের মধ্যে বাঁ দিক দিয়ে ওঠা কোলাসো দু’বার গোলের সুযোগ পেলেও উপস্থিত বুদ্ধির অভাবে সেগুলি হাতছাড়া করেন। ৪০ তম মিনিটেও তিনি বাঁ দিক দিয়ে বক্সে ঢুকে গোলকিপারের গায়ে শট মারেন। ফিরতি বলে বুমৌস শট নিলেও তা ডিফেন্ডাররা আটকে দেন।

সিংহভাগ আক্রমণ এটিকে মোহনবাগানের দিক থেকে এলেও মাঝে মাঝে প্রতি আক্রমণও চালিয়ে যায় নর্থইস্ট। ৩৯ তম মিনিটে এমনই এক আক্রমণে রোচারজেলার দূরপাল্লার শট অমরিন্দর বাঁ দিকে ড্রাইভ দিয়ে না আটকালে ব্যবধান বাড়িয়ে নিতে পারত গুয়াহাটির দল। এর আগে মাপুইয়ার দূরপাল্লার শটও বারের সামান্য ওপর দিয়ে উড়ে যায়।

বিরতিতে যাওয়ার মিনিট খানেক আগে কোলাসোর অসাধারণ হেডে সমতা এনে ফেলে এটিকে মোহনবাগান। মিরশাদের একটি মিসকিক থেকে বল পেয়ে রয় কৃষ্ণা বক্সের বাইরে ডানদিক থেকে লম্বা হাওয়ায় ভাসানো সেন্টার করেন বক্সের মধ্যে বাঁ দিকে থাকা অরক্ষিত কোলাসোকে। মাপা কোণাকুনি হেডে বল জালে জড়িয়ে দিতে ভুল করেননি তিনি। দ্বিতীয় পোস্টের ওপরের কোণ দিয়ে বল ঢুকে যায় গোলে। চলতি লিগে এটি চতুর্থ গোল তাঁর। ম্যাচের সেরার পুরস্কারও তিনিই পান।

তীব্র আক্রমণ দিয়ে দ্বিতীয়ার্ধ শুরু করে নর্থইস্ট। প্রথম পাঁচ মিনিটের মধ্যেই দু’টি গোলের সুযোগ তৈরি করে নেয় তারা, যা এটিকে মোহনবাগানের রক্ষণের তৎপরতায় সফল হয়নি। কিন্তু পাঁচ মিনিটের পর থেকেই খেলা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে চলে আসে এবং ডানদিকের উইং দিয়ে ওঠা হুগো বুমৌস চেনা মেজাজে ফিরে এসে ব্যবধান বাড়িয়ে নেন।

টানা আক্রমণের চাপ রাখতে না পেরে বুমৌসের কাছে প্রায় আত্মসমর্পণ করেন নর্থইস্টের ডিফেন্ডাররা। ৫৩ মিনিটের মাথায় বক্সের মধ্যে বাঁ দিক থেকে তাঁকে মাইনাস দেন শুভাশিস বোস এবং সেই বল পেয়েই ঠাণ্ডা মাথায় দুই ডিফেন্ডারকে ধোঁকা দিয়ে সোজাসুজি গোলে বল ঠেলে দেন ফরাসি অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার।

৬৪ মিনিটের মাথায় কার্ল ম্যাকহিউয়ের জায়গায় যখন জনি কাউকো মাঠে নামেন, তখন তাঁর দল রীতিমতো দাপুটে ফুটবল খেলছে। এই সময়েই মনবীর সিং বিপক্ষের বক্সে অনেকটা ঢুকে কোণাকুনি শট নিলেও তা বারের ওপর দিয়ে উড়ে যায়। এই জায়গা থেকে অবশ্য তাঁকে আগেও গোল করতে দেখা গিয়েছে। ৭২ মিনিটের মাথায় ফের গোলের সুযোগ পেয়ে যান বুমৌস। কিন্তু মিরশাদের তৎপরতায় সেই সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়।

তবে এই সুযোগ নষ্ট হওয়ার চার মিনিট পরেই ম্যাচের দ্বিতীয় গোলটি পেয়ে যান বুমৌস। ডানদিক দিয়ে ওঠা ফরাসি তারকাকে মাঝমাঠ থেকে বল বাড়িয়েছিলেন জনি কাউকো। নিখুঁত সেই পাস থেকে বল পেয়ে বক্সে ঢুকে ওয়ান টু ওয়ান পরিস্থতিতে গোলে ঠাণ্ডা মাথায় পায়ের টোকায় ফের বল ঠেলে দেন বুমৌস। তাঁকে এক ডিফেন্ডার তাড়া করলেও গতিতে পেরে ওঠেননি। এই গোলের পরেই লিস্টনের জায়গায় সুসাইরাজকে নামান ফেরান্দো। আশি মিনিটের পরে দীপক টাঙরির জায়গায় লেনি রড্রিগেজ ও বুমৌসের জায়গায় ডেভিড উইলিয়ামসকেও নামান তিনি।

নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার তিন মিনিট আগে দ্বিতীয় গোলটি পেয়ে যান মাশুর শেরিফ। বক্সের মধ্যে শুভাশিস বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে হেড করলে তাঁর মাথার বাঁ দিকে লেগে বল চলে যায় অরক্ষিত শেরিফের কাছে। ওই জায়গা থেকে শেরিফের প্রথম পোস্ট দিয়ে গোলে বল ঠেলতে কোনও অসুবিধাই হয়নি।

ম্যাচের একেবারে শেষ দিকে দু-দু’টি অবধারিত গোলের সুযোগ অবহেলায় হাতছাড়া করেন মনবীর। দিনটা যে তাঁর ছিল না, তা এ ভাবে সুযোগ হাতছাড়া করার দৃশ্যেই বোঝা যায়। স্টপেজ টাইমে রয় কৃষ্ণাও গোলের সামনে ক্রস দিলেও সেই বলে পা ছুঁইয়ে গোল করার মতো কেউ ছিলেন না। তবে তাতে তাঁদের দলের জয়ে ফেরা আটকায়নি। এর পরে ফের ২৯ ডিসেম্বর মাঠে নামবে এটিকে মোহনবাগান। সে দিন তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়া কোচ ফেরান্দোর সদ্য প্রাক্তন ক্লাব এফসি গোয়া। এই ম্যাচে জয় সবুজ-মেরুন বাহিনীকে ফের প্রথম চারে জায়গা করে দিতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.