নর্থ ইস্ট ম্যাচ হারল এসসি ইস্টবেঙ্গল

অঞ্জন চ্যাটার্জী, এনএফবিঃ

সাত-সাতটি ম্যাচ খেলা হয়ে গেলেও এখনও কোনও ম্যাচে পুরো তিন পয়েন্ট তুলতে পারল না এসসি ইস্টবেঙ্গল। শুক্রবার সন্ধ্যায় ফতোরদার জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে তারা হারল আইএসএলে একমাত্র ভারতীয় কোচের অধীনস্থ দল নর্থইস্ট ইউনাইটেড এফসি-র কাছে। গুয়াহাটির দল এ দিন ২-০-য় হারায় তাদের প্রতিবেশী রাজ্যের ক্লাবকে। এই নিয়ে চতুর্থবার হার মানল তারা। অন্য দিকে, নর্থইস্ট ভাঙাচোরা দল নিয়ে মাঠে নেমে এ দিন চলতি লিগের দ্বিতীয় জয়টি পেল। এই জয়ের ফলে সাত ম্যাচে সাত পয়েন্ট নিয়ে লিগ টেবলের সাত নম্বরে উঠে এল খালিদ জামিলের দল। এসসি ইস্টবেঙ্গল সাত ম্যাচে তিন পয়েন্ট নিয়ে রয়ে গেল ১১ নম্বরেই।

এ দিন প্রথমার্ধে এসসি ইস্টবেঙ্গল কিছুটা ভাল খেললেও দ্বিতীয়ার্ধের পুরোটাই বিপক্ষের আধিপত্য স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়। লাল-হলুদ বাহিনীর রক্ষণের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে ঘনঘন আক্রমণে উঠতে থাকে নর্থইস্ট এবং আট মিনিটের মধ্যে দু’টি গোল করে জয় নিশ্চিত করে ফেলে। প্রথম গোলটি করেন কেরলের ফরোয়ার্ড ভাডাক্কেপিডিকা সুহের ও প্রথম হিরো আইএসএল ম্যাচে খেলতে নামা অস্ট্রেলীয় ডিফেন্ডার প্যাট্রিক ফ্লোটম্যান দ্বিতীয় গোলটি করেন।

এ দিন চোট সারিয়ে কুড়ি দিন পরে মাঠে নামা গোলকিপার অরিন্দম ভট্টাচার্য দলকে আরও বড় ব্যবধানে হার থেকে বাঁচান অসাধারণ তৎপরতায় একাধিক গোল বাঁচিয়ে। পাঁচটি অবধারিত গোল বাঁচান তিনি। অন্য দিকে, চলতি লিগের দ্বিতীয় ম্যাচে নামা সুহেরের রাজ্যের গোলকিপার মিরশাদ মিচু এ দিন দু’টি নিশ্চিত গোল বাঁচিয়ে নর্থইস্ট ইউনাইটেডকে পুরো তিন পয়েন্ট জিততে সাহায্য করেন। ম্যাচের একেবারে শেষ দিকে মেজাজ হারিয়ে রেফারির সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে লাল কার্ড দেখেন এসসি ইস্টবেঙ্গলের নির্ভরযোগ্য ফরোয়ার্ড আন্তোনিও পেরোসেভিচ। অর্থাৎ, দলের পরের ম্যাচে তিনি নেই।

অরিন্দম ভট্টাচার্য যে এ দিন এসসি ইস্টবেঙ্গলের গোললাইনে ফিরে আসতে পারেন, তার ইঙ্গিত আগেই দিয়েছিলেন তাঁদের কোচ হোসে মানুয়েল দিয়াজ। ২৭শে নভেম্বরে কলকাতা ডার্বির কুড়ি দিন পরে তাঁকে ফের দেখা গেল মাঠে। এ ছাড়াও এ দিন চোট সারিয়ে মহম্মদ রফিক ও সৌরভ দাসকেও প্রথম দলে দেখা যায়। ড্যানিয়েল চিমা ও আন্তোনিও পেরোসেভিচকে সামনে রেখে ৪-৪-২-এ দল সাজান লাল-হলুদ কোচ।

অন্য দিকে, ফেদরিকো গালেগো ও দেশর্ন ব্রাউনকে ছাড়াই এ দিন দল নামান আইএসএলের একমাত্র ভারতীয় কোচ খালিদ জামিল। আগের দিন তিনি খাসা কামারাকে নিয়েও অনিশ্চয়তার কথা শোনালেও এ দিন কামারাকে প্রথম এগারোয় দেখা যায় এবং সারা মাঠ জুড়ে তাঁর পারফরম্যান্স তাঁকে ম্যাচের সেরার পুরষ্কার এনে দেয়। তাঁকে নিয়ে এ দিন মোট তিনজন বিদেশি ফুটবলার ছিলেন নর্থইস্টের প্রথম এগারোয়। অন্য দু’জন অস্ট্রেলিয়ান ডিফেন্ডার ফ্লোটম্যান ও স্প্যানিশ মিডফিল্ডার হারনান সান্তানা। জামিলের রিজার্ভ বেঞ্চেও কোনও বিদেশিকে দেখা যায়নি এ দিন।

লিগের প্রথম জয় পাওয়ার জন্য এসসি ইস্টবেঙ্গলের যতটা মরিয়া হয়ে ওঠা উচিত ছিল, তা তাদের মধ্যে এ দিন দেখা যায়নি প্রথম আধ ঘণ্টায়। নর্থইস্ট এফসি-রও বেশি ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়নি। ফলে দুই পক্ষের গোল এরিয়ায় তেমন ঝড় ওঠার ছবি দেখা যায়নি। প্রথম ৪৫ মিনিটে এসসি ইস্টবেঙ্গলের মাত্র একটি শট গোলে থাকলেও নর্থইস্টের কোনও শটই গোলমুখী ছিল না।

আন্তোনিও পেরোসেভিচ এ দিনও ছিলেন স্বমহিমায়। কিন্তু সেই পুরনো সমস্যার সম্মুখীন হন একাধিকবার। যোগ্য সঙ্গতের অভাব। একবার বাঁ দিক দিয়ে বল নিয়ে উঠে নিজেই গোলে শট নেন। কিন্তু গোলকিপারের হাতে বল তুলে দেন। আর একবার ডানদিক দিয়ে উঠে গোলের সামনে চিমাকে মাপা ক্রস দিলেও নাইজেরিয়ান ফরোয়ার্ড বলে পৌঁছতে পারেননি। এর আগেও একই ভাবে তাঁকে গোল মিস করতে দেখা গিয়েছিল। তাঁর সেই দুর্বলতা এখনও কাটেনি বলেই মনে হচ্ছে।

২৮ মিনিটের মাথায় প্রায় গোল পেয়েই গিয়েছিল এসসি ইস্টবেঙ্গল। এগিয়ে আসা নর্থইস্ট গোলকিপার মিরশাদের মাথার ওপর দিয়ে বল ঠেলে দেন পেরোসেভিচ যা গোল লাইনের ওপর থেকে তিনি গোলের সামনে পাঠালেও সহকারী রেফারি জানিয়ে দেন, বল গোললাইন পেরিয়ে গিয়েছে। তাই গোলের সামনে থেকেও কাজের কাজটা করার চেষ্টা করেননি চিমা। এই আক্রমণের পরেই চোট পেয়ে মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যান ফ্রানিও পর্চে ও তাঁর জায়গায় মাঠে নামেন আমির দার্ভিসেভিচ।

ধীর গতিতে নর্থইস্ট এ দিন ক্রমশ পাল্টা আক্রমণে উঠতে থাকে। কিন্তু ফিনিশিংয়ের দক্ষতার অভাবে কোনও বারই তা সুযোগে পরিণত করতে পারেনি তারা। এর মাঝে মাঝেই কাউন্টার অ্যাটাকে উঠছিলেন পেরোসেভিচ, চিমারা। দ্বিতীয়ার্ধের একেবারে শেষ মিনিটে নর্থইস্ট গোলকিপার মিরশাদ মিচুর মিস পাস নিয়ে বিপক্ষের বক্সে ঢুকে চিমাকে পাস দেন পেরোসেভিচ। কিন্তু এ বারেও গোলে বল ঠেলতে ব্যর্থ হন নাইজেরিয়ান ফরোয়ার্ড। এর চেয়ে ভাল গোলের সুযোগ তাঁরা সারা ম্যাচে আর পাননি।

দ্বিতীয়ার্ধে নাওরেম মহেশের জায়গায় বিকাশ জাইরুকে নামায় এসসি ইস্টবেঙ্গল। মহেশ প্রথমার্ধে হলুদ কার্ড দেখায় হয়তো আর তাঁকে মাঠে রাখার ঝুঁকি নেননি কোচ। কিন্তু বিকাশকে নামিয়ে তেমন কোনও লাভ হয়নি এসসি ইস্টবেঙ্গলের। উল্টে দ্বিতীয়ার্ধে গোলের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে নর্থইস্ট এবং ঘনঘন আক্রমণে উঠতে থাকে। প্রথমার্ধে যেখানে একটিও শট গোলে রাখতে পারেনি তারা, সেখানে দ্বিতীয়ার্ধে সাতটি গোলমুখী শট নেয় নর্থইস্ট ইউনাইটেড এফসি। যার মধ্যে পাঁচটি অরিন্দম বাঁচিয়ে নিলেও দু’টি পারেননি। এ জন্য তাদের অবশ্যই ধন্যবাদ দেওয়া উচিত এসসি ইস্টবেঙ্গলের প্রায় নিষ্ক্রীয় হয়ে পড়া রক্ষণ বিভাগকে। এই অর্ধে একটির বেশি শট গোলে রাখতে পারেনি লাল-হলুদ শিবির এবং বল দখলেও অনেক পিছিয়ে ছিল তারা।

দ্বিতীয়ার্ধে যে লক্ষ্য নিয়ে আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে খালিদ জামিলের দল, ৬১ মিনিটের মাথায় সেই লক্ষ্য পূরণ করেন ভি পি সুহের। বক্সের মধ্যেই যখন মাইনাস পেয়ে গোলে শট নেন সুহের, তখন সেখানে এসসি ইস্টবেঙ্গলের একাধিক ডিফেন্ডার ছিলেন। আমির দার্ভিসেভিচ তাঁকে বাধা দিতে এসেও সফল হননি।

এর দু’মিনিট পরেই সরাসরি গোলে শট নেন মাপুইয়া, যা অরিন্দম ডানদিকে ঝাঁপিয়ে না বাঁচালে দ্বিতীয় গোলটা পেয়ে যেত নর্থইস্ট। ৬৫ মিনিটের মাথায় গোল শোধ করার সুযোগও পেয়ে যায় লাল-হলুদ বাহিনী। কিন্তু মিরশাদের অসাধারণ তৎপরতায় সেই সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হয় কলকাতার দল। কামারার ব্যাকপাস ছিনিয়ে নিয়ে চিমাকে প্রায় গোল সাজিয়ে দেন হামতে। কিন্তু চিমা বলে পা লাগানোর আগেই মিরশাদ বলের দখল নিয়ে নেন। ফলে সেই সুযোগও হাতছাড়া হয়।

বিপক্ষের চাপ অবশ্য বেশিক্ষণ রাখতে পারেননি এসসি ইস্টবেঙ্গলের দুর্বল ও ছন্নছাড়া রক্ষণ বিভাগ। সেট পিস থেকে তারা দ্বিতীয় গোল খায় ৬৮ মিনিটের মাথায়। বক্সের বাইরে থেকে ফ্রিকিক নেন ম্যাথিয়াস কুরিয়র। বক্সের ডানদিক থেকে ইমরান দ্বিতীয় পোস্টের সামনে ফ্লোটম্যানের উদ্দেশ্যে ক্রস বাড়ান ও সম্পূর্ণ অরক্ষিত অস্ট্রেলীয় ডিফেন্ডার নিখুঁত হেডে গোলে বল ঠেলে দেন। নর্থইস্টের হয়ে প্রথম মাঠে নেমেই গোল পেয়ে গেলেন তিনি।

৮৪ মিনিটের মাথায় ফের ব্যবধান বাড়ানোর জায়গায় চলে এসেছিল লিগে একমাত্র ভারতীয় কোচের দল নর্থইস্ট ইউনাইটেড। কিন্তু সেই অপমান থেকে বাঁচাতে অরিন্দমকে কঠিন পরীক্ষায় পাস করতে হয়। ডিফেন্ডার গুরজিন্দর কুমার দূরপাল্লার শটে তৃতীয় গোলের চেষ্টা করলেও বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে তা বাঁচিয়ে নেন লাল-হলুদ অধিনায়ক। তার আগে ম্যাথিয়াস কুরিয়রের একটি শট গোলের বাইরে দিয়ে চলে যায়।

এসসি ইস্টবেঙ্গলকে লড়াই ফেরানোর চেষ্টায় ৮৮ মিনিটে গোলের সুযোগ তৈরি করেন চিমা। ডানদিক থেকে বল নিয়ে উঠে ক্রস দেন পেরোসেভিচকে। কিন্তু পেরোসেভিচের বাঁ পায়ে নেওয়া শট বারের ওপর দিয়ে উড়ে যায়। ৯০ মিনিটের মাথায় দার্ভিসেভিচের মাপা ফ্রিকিকে হেড করে গোলের দিকে বল ঠেলে দেন বলওয়ন্ত। কিন্তু ফের মিরশাদই দলের ত্রাতা হয়ে ওঠেন ও বলের দখল নিয়ে নেন।

লাল-হলুদ বাহিনীর হারের জ্বালায় প্রায় নুনের ছিটে দেয় স্টপেজ টাইমে আন্তোনিও পেরোসেভিচের লাল কার্ড দর্শন। খাসা কামারাকে ফাউল করার পরে রেফারির সঙ্গে অযথা তর্ক জুড়ে দিয়ে এই লাল কার্ড দেখেন তিনি, যার ফলে ২৩ ডিসেম্বর হায়দ্রাবাদ এফসি-র বিরুদ্ধে, পরবর্তী ম্যাচে তাঁকে পাবে না দল। ম্যাচের একেবারে শেষ মুহূর্তে সুহেরের আরও একটি গোলমুখী শট আটকে দলকে আরও একবার বাঁচান অরিন্দম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দলের হার বাঁচাতে পারেননি তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.