আশা জাগিয়েও চেন্নাই ম্যাচ ড্র করল এসসি ইস্টবেঙ্গল

অঞ্জন চ্যাটার্জী, এনএফবিঃ

একদিকে পরপর দু’টি ম্যাচ জিতে শুক্রবার ভাস্কর তিলক ময়দানে নেমেছিল চেন্নাইন এফসি। অন্যদিকে, ঠিক উল্টো মেরুতে ছিল এসসি ইস্টবেঙ্গল। পরপর দু’টি ম্যাচে হেরে ন’গোল খেয়ে দক্ষিণী দলের বিরুদ্ধে নামে তারা। খাতায় কলমে এসসি ইস্টবেঙ্গল এদিন পিছিয়ে থেকে নামলেও লড়াই করল সমানে সমানে। আগের দুই ম্যাচের চেয়ে অনেক উন্নত পারফরম্যান্স দেখিয়ে গোলশূন্য ড্র করে চলতি আইএসএলে দ্বিতীয় পয়েন্ট অর্জন করল তারা।

চেন্নাইন এফসি ঘন ঘন আক্রমণে ওঠার চেষ্টা করলেও তাদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দেন এসসি ইস্টবেঙ্গলের ডিফেন্ডাররা। আগের চেয়ে অনেক বেশি দায়িত্বশীল রক্ষণ বিভাগ এদিন লাল-হলুদ সমর্থকদের আশার আলো দেখাতে পারে। চেন্নাইনের দুই উইং দিয়ে আক্রমণের রাস্তা বন্ধ করার কাজেও এদিন যথেষ্ট সফল হয় এসসি ইস্টবেঙ্গল। সেট পিসে গোল খাওয়ার রোগও এদিন দেখা যায়নি তাঁদের মধ্যে। গত ম্যাচে জোড়া গোল পাওয়া ড্যানিয়েল চিমাকেও এদিন আগের চেয়ে উজ্জ্বল লেগেছে। গোলকিপার শুভম সেনও একাধিক অবধারিত গোল বাঁচিয়ে এদিন দলকে বিপদ থেকে বাঁচান। সব মিলিয়ে যথেষ্ট উন্নত পারফরম্যান্স দেখিয়ে জয়ে ফেরার ইঙ্গিত দিয়ে রাখলেন হোসে মানুয়েল দিয়াজের দলের ছেলেরা।

বাংলার ফুটবলপ্রেমীদের খুশি হওয়ারও দিন ছিল শুক্রবার। বাংলার চার ফুটবলারের অসাধারণ পারফরম্যান্সের জন্য। এসসি ইস্টবেঙ্গলের সাইড ব্যাক হীরা মন্ডল, যিনি ম্যাচের সেরার পুরস্কারটি পান এবং তাঁর সতীর্থ মিডফিল্ডার মহম্মদ রফিক, গোলকিপার শুভম ও চেন্নাইনের ফরোয়ার্ড রফিক আলি এদিন মন জয় করে নেওয়ার মতো পারফরম্যান্স দেখান। ম্যাচটা গোলশূন্য থাকলেও আনন্দ পাওয়ার মতো ফুটবল দেখা গিয়েছে এদিন। এই ড্রয়ের ফলে তিন ম্যাচে সাত পয়েন্ট পেয়ে লিগ টেবলের শীর্ষে উঠে এল চেন্নাইন এফসি।

এসসি ইস্টবেঙ্গল চতুর্থ ম্যাচে দ্বিতীয় ড্র করে দশ নম্বর থেকে একধাপ ওপরে উঠে এল।

আগের দিনের প্রথম এগারো থেকে রাজু গায়কোয়াড়, ফ্রানিও পর্চে, বিকাশ জায়রু ও আন্তোনিও পেরোসেভিচকে বাদ দিয়ে এদিন দলকে ৪-৪-২-এ সাজান এসসি ইস্টবেঙ্গল কোচ দিয়াজ। জয়নার লরেঙ্কো, অমরজিৎ সিং কিয়াম ও গত ম্যাচের জোড়া গোলদাতা ড্যানিয়েল চিমাকে এদিন প্রথম দলে রাখেন তিনি। আক্রমণে চিমা ও সিডোল এবং তাঁদের পিছনে ছিলেন নাওরেম মহেশ, রফিক, দার্ভিসেভিচ ও অমরজিৎ। দুই সাইডব্যাক হীরা ও ড্যানিয়েল গোমস এবং স্টপার মর্চেলা ও লরেঙ্কো। অন্য দিকে, রহিম আলিকে সবার সামনে রেখে চেন্নাইনের দলকে ৪-২-৩-১-এ সাজান তাদের কোচ বান্দোভিচ। তাঁর পিছনে ছাঙতে, ভ্লাদিমির কোম্যান ও মিরলান মুরজায়েভ।

শেষ তিন ম্যাচের মতোই এদিন দ্রুত ও আত্মবিশ্বাসী শুরু করে লাল-হলুদ বাহিনী। মাঝে মাঝে কাউন্টার অ্যাটাকেও ওঠে চেন্নাইন। ৯ ও ১০ মিনিটের মাথায় পরপর দু’টি অবধারিত গোল বাঁচান লাল-হলুদ গোলকিপার শুভম। প্রথমবার গোলের সামনে থেকে শট নিয়েছিলেন মুরজায়েভ ও পরেরবার বক্সের মাথা থেকে ছাঙতে। এই দুই সেভের ফলে সারা ম্যাচেই তাঁকে আত্মবিশ্বাসী মনে হয়। যার জেরে পরে রহিম আলিকেও অবধারিত গোল থেকে বঞ্চিত করেন শুভম।

চিমাকে এ দিন শুরু থেকেই কিছুটা তৎপর লাগে। কিন্তু তিনি বল ধরলেই তাঁকে আটকানোর দায়িত্ব নিয়ে নেন চেন্নাইনের কোনও না কোনও ফুটবলার। প্রথম ১৫ মিনিট বল পজেশনের শতকরা হিসাব ছিল প্রায় সমান সমান। তবে ১৫ মিনিটের পর থেকে চেন্নাইনের খেলোয়াড়রাই বেশির ভাগ আক্রমণে উঠতে শুরু করেন। লাল-হলুদ শিবির মাঝে মাঝে আক্রমণে উঠলেও বক্সের সামনে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলছিলেন তাঁরা। চেন্নাইয়ের রক্ষণও ছিল যথেষ্ট সতর্ক।

ক্রমশ এসসি ইস্টবেঙ্গলের রক্ষণকে চাপে ফেলা শুরু করতে থাকে চেন্নাইন। তবে আগের তিন ম্যাচের চেয়ে এদিন বিপক্ষের সেট পিস নিয়ে অনেক বেশি সতর্ক ছিল লাল-হলুদ সদস্যরা, এই ম্যাচের আগে যা বারবার তাঁদের বুঝিয়েছেন কোচ দিয়াজ। এক ডজন কর্নার ও আটটি ফ্রিকিক পেয়েও তা থেকে গোল পায়নি চেন্নাইয়ের দল। লাল-হলুদ ডিফেন্ডারদেরও এ দিন উন্নত লেগেছে। তবে যথার্থ উইং প্লে-র অভাবে কলকাতার দলের আক্রমণে সে রকম ধার দেখা যায়নি। বিপক্ষের গোল এরিয়ায় বেশি ঢুকতেই পারেনি তারা। সারা ম্যাচে তারা মাত্র একটি শট গোলে রাখতে পেরেছে। তাও সেটা দ্বিতীয়ার্ধে।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে রক্ষণে শক্তি বাড়ানোর উদ্দেশ্যে আদিল খান ও রাজু গায়কোয়াড়কে নামানো হয় ড্যানিয়েল গোমস ও লরেঙ্কোর জায়গায়। তবে আক্রমণ বিভাগে কোনও তরতাজা ফুটবলারকে নামানো হয়নি এই সময়ে। ৫৬ মিনিটের মাথায় সেই পরিবর্তনটা হয়। সিডোলের জায়গায় নামেন আন্তোনিও পেরোসেভিচ।

চেন্নাই ক্রমশ আক্রমণের ধার বাড়ানোর চেষ্টা করে এবং চাপ বেড়ে যাওয়ায় গোলকিপার শুভমও পরপর দুটো ভুল করে ফেলেন, যা দলকে বিপদে ফেলতে পারত। এদিন চেন্নাইনের আক্রমণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেন বাংলার ফুটবলার রহিম আলি। তিনি এ দিন একাধিক গোলের সুযোগ তৈরির চেষ্টা করেন। দুর্দান্ত কিছু গোলের ক্রসও দেন। এসসি ইস্টবেঙ্গলের সৌভাগ্য যে, তাঁর সেই গোলের পাসগুলো শেষ পর্যন্ত কাজে লাগাতে পারেননি তাঁর সতীর্থরা। ৮১ মিনিট পর্যন্ত খেলে তিনি মাঠ ছেড়ে যান ও তাঁর পরিবর্তে নামেন জবি জাস্টিন।

এসসি ইস্টবেঙ্গলের কোচ দিয়াজ ৬৪ মিনিটের মাথায় অমরজিতের জায়গায় নামান বিকাশ জাইরুকে। উদ্দেশ্য, যাতে উইং প্লে আরও ভাল হয়। ৭০ মিনিটের মাথায় পেরোসেভিচের ডান দিক থেকে বাড়ানো বলে বক্সের মধ্যে গোলের সুযোগ পেয়ে গিয়েছিলেন চিমা। কিন্তু তিনি গোলে শট নেওয়ার আগেই ডিফেন্ডার স্লাভকো দামিয়ানোভিচ তাঁকে আটকে দেন।

৭৫ মিনিটের মাথায় গোলের সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে যায় এসসি ইস্টবেঙ্গল। বক্সের সামনে বাঁ দিক থেকে নেওয়া দার্ভিসেভিচের নিখুঁত ও মাপা ফ্রি কিকে ঠিকমতো মাথা ছোঁয়াতে পারলে অবধারিত ভাবে গোল পেতেন গোললাইনের সামনে থাকা রাজু। কিন্তু তাঁর হেড মাটিতে ড্রপ করে বারের ওপর দিয়ে চলে যায়।

নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আট মিনিট আগে ডান দিক থেকে ওঠা পেরোসেভিচ ফের বক্সের মধ্যে মাপা সেন্টার করেছিলেন, যা থেকে মহম্মদ রফিক গোলের সুযোগ পেয়েও ব্যর্থ হন। এর পরেই পেশীতে টান ধরায় রফিক বসে যান ও তাঁর জায়গায় নামেন সৌরভ দাস। সাইড ব্যাক হীরা মন্ডল এ দিন অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন। একা যেমন বিপক্ষের অ্যাটাকরদের সামলান, তেমনই মাঝমাঠে উঠে গিয়ে গোলের সুযোগ তৈরি করার জন্য পাসও দেন সতীর্থদের। মাঝমাঠ ও আক্রমণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার মরিয়া চেষ্টা করেন রফিক। কিন্তু বিপক্ষের ডিফেন্ডারদের তৎপরতায় বারবার আটকে যান।

ম্যাচের শেষ দিকে বিপক্ষের গোলের কাছাকাছি দু’টি লম্বা থ্রো করেন রাজু ও একটি কর্নার কিকও পায় এসসি ইস্টবেঙ্গল। কিন্তু এই সেটপিসগুলো কোনওটাই কাজে লাগাতে পারেনি তারা। স্টপেজ টাইমে কাউন্টার অ্যাটাক থেকে গোলের সুযোগ পায় চেন্নাইন এফসি। কিন্তু তা ক্লিয়ার করে দেয় লাল-হলুদ রক্ষণ। ম্যাচের শেষ মিনিটে বিপক্ষের বক্সের সামনে থেকে ফ্রি-কিক পায় এসসি ইস্টবেঙ্গল। কিন্তু পেরোসেভিচের ফ্রি কিক দেওয়ালে লেগে গোল লাইনের বাইরে চলে যায় ও কর্নার পেয়ে যায় লাল-হলুদ বাহিনী। তাও কাজে লাগাতে পারেনি তারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.