উইলিয়ামাসের গোলেও জয় পেলো না বাগান

অঞ্জন চ্যাটার্জী, এনএফবিঃ

সমানে সমানে লড়াই যাকে বলে, বুধবার ফতোরদার জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে ঠিক সেটাই দেখা গেল। লিগ টেবলের এক নম্বরে ওঠার এই লড়াইয়ে ২-২ ড্র করল এটিকে মোহনবাগান ও হায়দ্রাবাদ এফসি। হিরো আইএসএলের দ্রুততম গোল দিয়ে যে ম্যাচ শুরু হয়, বুধবার সেই ম্যাচ শেষ হয় জেভিয়ার সিভেরিওর দুর্দান্ত হেডে করা গোল দিয়ে। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে এই গোল করে কার্যত এটিকে মোহনবাগানের মুখের গ্রাস কেড়ে নেন হায়দ্রাবাদ এফসি-র পরিবর্ত ফরোয়ার্ড।

পয়েন্ট ভাগাভাগির পরে লিগ টেবলে এক নম্বরে চলে গেল হায়দ্রাবাদ এফসি। মুম্বই সিটি এফসি ও তাদের সংগ্রহ ১৬ পয়েন্ট করে। ১৫ পয়েন্ট নিয়ে এটিকে মোহনবাগান কেরালা ব্লাস্টার্সকে সরিয়ে চার থেকে উঠে এল তিন নম্বরে। কেরালা ব্লাস্টার্স ১৪ পয়েন্ট নিয়ে তিন থেকে নেমে গেল চারে।

বুধবার ফতোরদায় অনবদ্য ফুটবল খেলে দুই দলই। তীব্রতায় পরিপূর্ণ ম্যাচে আগ্রাসনের প্রায় চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায় দুই পক্ষই। ১২ সেকেন্ডে ঐতিহাসিক গোল দিয়ে দলকে এগিয়ে দেন এটিকে মোহনবাগানের তারকা ফরোয়ার্ড ডেভিড উইলিয়ামস। ১৮ মিনিটের মাথায় বিপক্ষের গোলকিপার অমরিন্দরের ভুলকে কাজে লাগিয়ে সমতা আনেন হায়দ্রাবাদের নাইজেরিয়ান ফরোয়ার্ড বার্থোলোমিউ ওগবেচে।

৬৪ মিনিটে আশিস রাইয়ের নিজ গোলে ফের ব্যবধান তৈরি করে সবুজ-মেরুন বাহিনী এবং স্টপেজ টাইমের দ্বিতীয় মিনিটে সিভেরিওর দুর্দান্ত গোল এটিকে মোহনবাগানের টেবল টপার হওয়ার স্বপ্ন চুরমার করে দেয়। প্রথমার্ধের শেষে বিপক্ষের এক খেলোয়াড়ের সঙ্গে প্রবল সঙ্ঘর্ষে গুরুতর আহত হন কলকাতার দলের মিডফিল্ডার কার্ল ম্যাকহিউ। তাঁকে অ্যাম্বুল্যান্সে তুলে সোজা হাসপাতালে পাঠানো হয়।

১ মিনিটঃ ডেভিড উইলিয়ামসের দ্রুততম গোল। কিক অফের পরেই ডানদিকের উইং দিয়ে ঝড়ের গতিতে হুগো বুমৌসের সঙ্গে ওয়ান-টু খেলতে খেলতে বক্সের মাথায় এসে সোজা গোলে শট নেন ডেভিড।
১৮ মিনিটঃ ১-১। উইং থেকে আসা একটি উড়ন্ত ক্রস লাফিয়ে আটকাতে যান অমরিন্দর। তাঁর হাত ফস্কে গিয়ে বল পড়ে সামনেই থাকা ওগবেচের পায়ে এবং গোল করতে বিন্দুমাত্র ভুল করেননি তিনি।
৪০ মিনিটঃ কার্লের মাথায় চোট। বিপক্ষের এক খেলোয়াড়ের সঙ্গে প্রবল সঙ্ঘর্ষে মাঠে লুটিয়ে পড়েন কার্ল ম্যাকহিউ। অ্যাম্বুলেন্সে উঠিয়ে কার্লকে মাঠের বাইরে সোজা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
৬৪ মিনিটঃ ২-১। বক্সের ডানদিকে ঢুকে ডেভিড ক্রস দেন কাউকোর উদ্দেশ্যে। উড়ন্ত বলে হেড করে কাউকো বলের গতিপথ বদলে দেন গোলের দিকে, যা আশিস রাইয়ের পায়ে লেগে গোলে ঢুকে যায়।
৯০+২ মিনিটঃ ২-২। ফ্রিকিকের পরে হওয়া সেন্টারে উড়ে আসা বল বক্সের মাঝখান থেকে হেড করে জালে জড়িয়ে দেন পরিবর্ত হিসেবে নামা ফরোয়ার্ড সিভেরিও।
ম্যাচের আগে এটিকে মোহনবাগানের প্রথম এগারোয় রয় কৃষ্ণাকে না দেখে অনেকেই অবাক হয়েছিলেন। কিন্তু ১২ সেকেন্ডের মাথায় ডেভিড উইলিয়ামসের গোল সে সব বিস্ময়ই প্রায় ভুলিয়ে দেয়। কিক অফ হওয়ার ১২ সেকেন্ডের মাথায় যে গোলটি দেন ডেভিড, তাকে অসাধারণ বললেও কম বলা হয়।

হুয়ান ফেরান্দোর আক্রমণ-নির্ভর ফুটবলের দর্শন যে বেশ পছন্দ করছেন তাঁর দলের ফুটবলাররা, এই গোল তারই প্রমাণ বলা যায়। কিক অফের পরেই ডানদিকের উইং দিয়ে ঝড়ের গতিতে ওয়ান-টু খেলতে খেলতে বিপক্ষের বক্সের মাথায় এসে সোজা গোলে শট নেন ডেভিড উইলিয়ামস এবং এই শটেই এগিয়ে যায় সবুজ-মেরুন শিবির। হিরো আইএসএলের দ্রুততম গোল এটাই। পাঁচটি টাচে আসা এই গোল শেষে হুগো বুমৌসের ব্যাকপাস থেকে করেন ডেভিড।

শুরুতেই গোল খেয়ে হতভম্ব না হয়ে হায়দ্রাবাদের ফুটবলাররা ঘন ঘন আক্রমণে উঠে বিপক্ষকে পাল্টা চাপে ফেলা শুরু করে দেন। গোলের পর চার-পাঁচ মিনিট ধরে প্রায় আক্রমণের ঝড় তুলে দেন বার্থোলোমিউ ওগবেচে, এডু গার্সিয়া, অনিকেত যাদবরা। ক্রমশ খেলার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দিকে নিয়ে এসে এটিকে মোহনবাগানও প্রতি আক্রমণে উঠে ব্যবধান বাড়ানোর চেষ্টা শুরু করে।

ঘন ঘন কাউন্টার অ্যাটাকে যেতে শুরু করে দুই দলই। যার জেরে দুই গোলকিপারের ওপরই বেশ চাপ ছিল। হায়দ্রাবাদের গোলকিপার লক্ষ্মীকান্ত কাট্টিমনি এই চাপ সামলে নিতে পারলেও তাদের বিপক্ষের গোলকিপার অমরিন্দরকে শুরু থেকেই নড়বড়ে লাগছিল। ১৮ মিনিটের মাথায় যে ভাবে সমতা আনে হায়দ্রাবাদ এফসি, তা মূলত মনবীরেরই ভুলে।

উইং থেকে আসা একটি উড়ন্ত ক্রস লাফিয়ে উঠে আটকাতে যান অমরিন্দর। যা তাঁর হাত ফস্কে গিয়ে পড়ে সামনেই থাকা ওগবেচের পায়ে এবং চলতি লিগে আট গোলের মালিক এই নাইজেরিয়ান তাঁর নবম গোলটি করতে বিন্দুমাত্র ভুল করেননি। এর পরেও অমরিন্দর একটি গোলকিক ভুল করে দিয়ে ফেলেন, ফের সেই ওগবেচেরই পায়ে। তবে সেই যাত্রায় আর গোল খাননি তিনি। ওগবেচের দুর্বল শট আটকে দেন অমরিন্দর।

জলপানের বিরতির পরেও দুই দলই একে অপরকে চাপে ফেলার চেষ্টা চালিয়ে যায় অনবরত। তবে দু’পক্ষেরই রক্ষণ যথেষ্ট শক্তিশালী হওয়ায় কোনও পক্ষই গোলের খুব কাছে ঘেঁষতে পারেনি। তবে ডেভিড উইলিয়ামসকে সামলাতে এ দিন হিমশিম খান চিঙলেনসানা সিং, আশিস রাই-রা। বারবার আক্রমণে উঠলেও এ দিন দু’টি গোল ছাড়া এটিকে মোহনবাগান সারা ম্যাচে মাত্র একটি গোলমুখী শট নিতে পেরেছে (নীচে পরিসংখ্যান দেখুন)। সে দিক থেকে অনেক এগিয়ে ছিল হায়দ্রাবাদ (৮)।

খেলার তীব্রতা এতটাই বেড়ে যায় যে, ৪০ মিনিটের মাথায় বিপক্ষের এক খেলোয়াড়ের সঙ্গে প্রবল সঙ্ঘর্ষের পরে মাঠে লুটিয়ে পড়েন কার্ল ম্যাকহিউ। বেশ কিছুক্ষণ খেলা বন্ধ থাকার পরে অ্যাম্বুলেন্সে উঠিয়ে কার্লকে মাঠের বাইরে সোজা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। অ্যাম্বুলেন্সে ওঠার সময় সতীর্থদের সঙ্গে কথা বলে যান কার্ল। তাঁর জায়গায় নামেন জনি কাউকো। পরের মুহূর্তেই প্রীতম কোটাল ও ওগবেচের মধ্যেও ধাক্কা লাগে। কিন্তু কেউই গুরুতর চোট পাননি।

খেলার তীব্রতার জেরে হলুদ কার্ড দেখেন ডেভিড উইলিয়ামস এবং এডু গার্সিয়াও। পরে কাউ্টার অ্যাটাকে ওঠার সময় বুমৌসকে অবৈধ ভাবে বাধা দিয়ে হলুদ কার্ড দেখেন আশিস রাই। ওই সময়ে তিনি বুমৌসকে না আটকালে এটিকে মোহনবাগান হয়তো ব্যবধান বাড়িয়ে নিত। এর এক মিনিটের মধ্যে চতুর্থ রেফারির সঙ্গে তর্ক জুড়ে হলুদ কার্ড দেখেন বুমৌসও। স্টপেজ টাইমে ডেভিড বক্সের মধ্যে বিপজ্জনক জায়গায় বল ঠেললেও তা ব্লক করে দেন আকাশ মিশ্র। প্রথমার্ধেই পাঁচটি হলুদ কার্ড দেখে ফেলেন দুই দলের ফুটবলাররা। তবে দ্বিতীয়ার্ধে আর কোনও কার্ড বার করতে হয়নি রেফারিকে।

দ্বিতীয়ার্ধে লেনি রড্রিগেজকে মাঠে নামান ফেরান্দো। তুলে নেন দীপক টাঙরিকে। আক্রমণে তীব্রতা বাড়ানোর জন্যই এই পরিবর্তন করেন সবুজ-মেরুন কোচ। আক্রমণের ধারও বাড়ে। কিন্তু হায়দ্রাবাদের দুর্ভেদ্য রক্ষণের দেওয়াল ভাঙা মোটেই সোজা ছিল না। ৫৫ মিনিটের মাথায় তিন সতীর্থকে নিয়ে বিপক্ষের বক্সে ঢুকে পড়েন ডেভিড উইলিয়ামস। হুগো বুমৌস গোলে শটও নেন। কিন্তু হিতেশ শর্মা তা ব্লক করে দেন।

এর চার মিনিট পরেই ব্যবধান বাড়ানোর সুযোগ পেয়ে যান এডু গার্সিয়া। সোজা গোলে শট নেন তিনি। কিন্তু ম্যাচে এই প্রথমবার বাঁ দিকে ডাইভ দিয়ে ভাল একটা সেভ করেন অমরিন্দর। এই শটে ব্যর্থ হওয়ার পরেই এডুকে তুলে নেন হায়দ্রাবাদ কোচ মানুয়েল মার্কেজ।

এডু মাঠ ছেড়ে চলে যাওয়ার চার মিনিট পরেই দ্বিতীয় গোলটি তুলে নেয় এটিকে মোহনবাগান। গোলটা কাউকোর মাথা থেকে হলেও অর্ধেকের বেশি কৃতিত্ব দিতে হবে ডেভিড উইলিয়ামসকে। ৬৪ মিনিটের মাথায় বক্সের বাইরে থেকে দুই ডিফেন্ডারকে ধোঁকা দিয়ে বক্সের ডানদিকে ঢুকে তিনি ক্রস দেন কাউকোর উদ্দেশ্যে। উড়ন্ত বলে হেড করে কাউকো বলের গতিপথ বদলে দেন গোলের দিকে, যা আশিস রাইয়ের পায়ে লেগে গোলে ঢুকে যায়।

৭১ মিনিটের মাথায় ওয়ান টু ওয়ান পরিস্থিতিতে গোল করতে ব্যর্থ হন লিস্টন কোলাসো, যিনি এ দিনই ম্যাচের আগে ডিসেম্বরের সেরা উঠতি তারকার খেতাব পান। বাঁ দিক দিয়ে ওঠা কোলাসোকে পাসটি দিয়েছিলেন সেই ডেভিড। কিন্তু বক্সে ঢুকে প্রায় ৪৫ ডিগ্রিরও বেশি কোণ থেকে কার্লিং শট নিলেও তা গোলের বাইরে চলে যায়।

৭২ মিনিটের মাথায় ডেভিড উইলিয়ামসের জায়গায় রয় কৃষ্ণাকে নামান কোচ ফেরান্দো। এর তিন মিনিট পরেই অমরিন্দরের পায়ের পেশীতে টান ধরে। তবে তিনি খেলা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তই নেন। ৮২ মিনিটের মাথায় সত্যসেন সিংয়ের গোলমুখী হেড বাঁচিয়ে নেন সবুজ-মেরুন গোলকিপার।

শুধু আক্রমণে নয়, রক্ষণেও এ দিন যথেষ্ট তৎপর ছিল এটিকে মোহনবাগান। তিরি, প্রীতম, প্রবীররা যথেষ্ট সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে লড়াই করেন এ দিন। ৮৪ মিনিটের মাথায় হায়দ্রাবাদের সাতজন খেলোয়াড় একসঙ্গে আক্রমণে ওঠেন, যা বক্সে পৌঁছনোর আগেই অসাধারণ ক্লিয়ার করে বানচাল করে দেন কাউকো। একেবারে শেষ মিনিটে কোলাসোর জায়গায় শুভাশিস বোসকে নামিয়ে রক্ষণকে আরও জমাটবদ্ধ করার চেষ্টা করেন ফেরান্দো।

কিন্তু সেই জমাটবদ্ধ ডিফেন্সের বুক চিরেই ফ্রি কিক থেকে গোল করে ম্যাচের শেষ মুহূর্তে সমতা আনেন হায়দ্রাবাদের সুপার সাব জেভিয়ার সিভেরিও। ফ্রিকিকের পরে হওয়া সেন্টারে উড়ে আসা বলে বক্সের মাঝখান থেকে হেড করে জালে জড়িয়ে দেন পরিবর্ত হিসেবে নামা এই ফরোয়ার্ড। তিরি পিছন থেকে তাঁকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেও সফল হননি। চলতি লিগে এটি তাঁর তৃতীয় গোল এবং তিনটি গোলই পরিবর্ত হিসেবে নেমে করেছেন তিনি। শেষ মিনিটের ফ্রিকিকে বিপক্ষের গোলের সামনে বল নিয়ে গিয়েও শুভাশিস সফল হতে পারেননি। তিনি অবশ্য অফ সাইডে ছিলেন।

খবরটি প্রয়োজনীয় মনে হলে শেয়ার করুন

নিউজফ্রন্ট বাংলার এর ফেসবুক পেজে লাইক দিতে এখানে ক্লিক করুন
WhatsApp এ নিউজ পেতে জয়েন করুন আমাদের WhatsApp গ্রুপে
আপনার মতামত বা নিউজ পাঠান এই নম্বরে : +91 95936 66485

Leave a Reply

Your email address will not be published.